বাংলাতে দামोदर মাস হলো কার্তিক মাস। এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একটি অত্যন্ত শুভ মাস, যা সাধারণত ইংরেজি ক্যালেন্ডারের অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসের মধ্যে পড়ে। এই মাসে ভক্তরা ভগবান কৃষ্ণের দড়িতে বাঁধা হওয়ার লীলার স্মরণ করে এবং প্রদীপ নিবেদন করে।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য:
- কার্তিক মাসকে ভগবান দামোদরের প্রিয় মাস বলা হয়।
- এই মাসে ভক্তিসহকারে ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রদীপ নিবেদন করলে অজ্ঞান অন্ধকার দূর হয় এবং হৃদয়ে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলে ওঠে, যা কলুষতা থেকে মুক্তি দেয়।
- এই মাসে করা যেকোনো সৎকর্মের ফল শতগুণ বৃদ্ধি পায় বলে বিশ্বাস করা হয়।
- এই মাসে তুলসী গাছের নিচে বা মন্দিরে বিষ্ণুর প্রীতি লাভের জন্য প্রদীপ বা দ্বীপ দান করা হয়।
- দামোদর মাস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো মা যশোদা কর্তৃক দড়িতে কৃষ্ণকে বাঁধার চেষ্টা করার ঘটনাকে স্মরণ করা।
সংক্ষেপে, দামোদর মাস বা কার্তিক মাস হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র এবং >>ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা স্মরণ ও >>আরাধনা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
চলছে দামোদর মাস, এ প্রসঙ্গে জেনে নিন-
দামোদর ব্রত কী ও কেনো ?
সাধারণভাবে দামোদর শব্দের উৎপত্তি হলো, দাম+উদর=দামোদর, এইভাবে | এখানে ‘দাম’ মানে হলো রজ্জু বা দড়ি, আর উদর মানে হল পেট | এই কার্ত্তিক মাসে যশোদা, শ্রীকৃষ্ণকে দড়ি দিয়ে পেট তথা উদরে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলো ব’লে এবং শেষ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছাতেই সফল হয়ে ছিলো ব’লে শ্রীকৃষ্ণের এই লীলাকে ‘দামবন্ধন’ লীলা বলা হয় | কিন্তু শুধুমাত্র এইভাবে বিবেচনা করলে দামবন্ধন লীলায় শিশু কৃষ্ণ যে দুইটি অর্জুন গাছকে উৎপাটিত করেছিলো, তার সেই ক্ষমতাকে অবহেলা করা হয়, এজন্য দামোদর শব্দটিকে যদি ‘দম+উদর’= দামোদর, এইভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে আমি মনে করি শ্রীকৃষ্ণের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন ও তার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়।
দম+উদর = দমোদর>দামোদর,এখানেও উদর শব্দের অর্থ পেট এবং দম শব্দের অর্থ সাধারণভাবে শ্বাস হলেও, এর অন্তর্নিহিত অর্থ সাহস । আবার মানুষের সাহসের সঙ্গে বুকের একটা ব্যাপার আছে, তাই সাহস বলতে বোঝানো হয় ‘বুকের পাটা’কে। কিন্তু সাহস বোঝাতে কলিজারও একটা ব্যাপার আছে, এজন্য বেশি সাহসকে বোঝাতে কথ্য ভাষায় বলা হয় ‘তোর এত বড় কলজা ?’ এবং কলিজা থাকে যেহেতু পেটে বা উদরে, তাই এখানে উদর মানেও বুকের পাটা অর্থে সাহস এবং এই উদরের সাথে দম যুক্ত হয়ে দামোদর শব্দের অর্থ হয়েছে ‘দুঃসাহস’ বা ‘অবিশ্বাস্য ক্ষমতা’। বিষ্ণুর এক নাম দামোদর এবং এই সূত্রে বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার কৃষ্ণেরও এক নাম দামোদর। কিন্তু এই দামোদর শব্দটি কিভাবে কৃষ্ণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলো, তা বুঝতে পারবেন নিচে বর্ণিত কৃষ্ণের এই ‘দামবন্ধন’ লীলার দিনের পুরো ঘটনাটা জানলে-
আমরা প্রায় সবাই জানি- কৃষ্ণ, বাল্যকালে ননী চুরি করতো। কিন্তু এটা আমরা প্রায় কেউই জানি না যে, কৃষ্ণ সেই ননীগুলো আসলে কেনো চুরি করতো ? আর আমাদের এই অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে মুসলমানরা প্রচার করে বা করছে যে, হিন্দুদের ভগবান ছোট বেলায় গ্রামের প্রতিটা বাড়ি থেকে ননী চুরি করে খেতো, যে ভগবান চুরি করে, সে আবার কেমন ভগবান, ইত্যাদি ইত্যাদি।
যা হোক, কেউ যদি বৃন্দাবনে বেড়াতে গিয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয় দেখেছেন যে, সেখানে এখনও অনেক বানর বাস করে এবং এই বানরেরা অনেক সময় মানুষের হাত থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে গিয়ে খায় বা অনেক সময়- চশমা, টুপি বা এই জাতীয় কোনো মূল্যবান সামগ্রী মানুষের অসাবধানে মানুষের কাছ থেকে ছিনতাই করে নিয়ে গিয়ে মানুষকে জিম্মী করে তাদের কাছ থেকে খাবার আদায় করে খায়। সারা পৃথিবীর মতো বর্তমানে বৃন্দাবনেও জঙ্গল অনেক কমে এসেছে, তারপরও যদি এখনও সেখানে এত পরিমান বানর থাকে, তাহলে কৃষ্ণের যুগে সেখানে কী পরিমান জঙ্গল আর কত সংখ্যায় বানর ছিলো সেটা একবার কল্পনা করুন। বিবর্তনবাদ তো প্রমান করেই দিয়েছে যে মানুষের পূর্বপুরুষ হলো বানর প্রজাতির প্রাণী শিম্পাঞ্জি। একারণেই শিম্পাঞ্জি বা বানরের সাথে মানুষের জ্বীনগত মিল খুব খুব বেশি। আর একারণেই শুধু মানুষের আচার আচরণ, চেহারা বা দৈহিক গঠনের দিক থেকেই নয়, মানুষের খাবার দাবারের সাথেও শিম্পাঞ্জি বা বানরের খাবার দাবারের রয়েছে প্রচুর মিল। মানুষ যে সকল খাবার খায়, বানর তার প্রায় সকল খাবারই খায়। তাই, শুধু ননীই নয়, দুধ থেকে উৎপন্ন অন্যান্য খাবারও কৃষ্ণ নিজে খাওয়ার সময়, যখন তার আশে পাশে বানররা এসে জড়ো হতো, তখন কৃষ্ণ তাদেরকেও খাওয়াতো। আর কৃষ্ণের এই স্বভাব বুঝতে পেরে বানররা, তাদের ক্ষুধা পেলেই কৃষ্ণের বাড়ির আশে পাশে এসে হাজির হতো, কৃষ্ণের মা তো আর প্রতিদিন ঐসব বানরদেরকে খাওয়ানোর জন্য কৃষ্ণকে ননী বা অন্যান্য খাবার দিতো না, তখন মাঝে মাঝে কৃষ্ণকে ঐসব বানরদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য মায়ের অলক্ষ্যে ননী চুরি করতে হতো। মূল ঘটনা হচ্ছে এটাই, অথচ আমাদের অজ্ঞানতার কারণেই আমরা জেনে এসেছি এবং বিশ্বাস করে এসেছি যে, বাল্যকালে কৃষ্ণের একমাত্র কাজই ছিলো ননী চুরি করে খাওয়া, যেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মুসলমানরা এখন প্রচার করছে যে, কৃষ্ণ- গ্রামের প্রতিটা বাড়ি থেকে ননী চুরি করে খেতো! ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, এটা মুহম্মদের লুঠপাটকে জায়েজ করার একটা অপচেষ্টা মাত্র। কেননা, নেট-ফেসবুকের কল্যানে এখন এটা অনেকেই জানে যে, মুহম্মদ তার দলবল নিয়ে জিহাদের নামে অমুসলিমদের সম্পদ লুঠপাট করতো, যাতে তার নিজের কমিশন ছিলো ২০%; যদিও এই কথা এখন বললেই, সেটা হবে নবীর নামে কটূক্তি, আর ঘাড়ে পড়বে চাপাতির কোপ বা যেতে হবে জেলে, তবু সত্য তো আর মিথ্যা হয়ে যাবে না, কারণ এটাকে অস্বীকার করলে কোরানকে অস্বীকার করা হবে। দেখি, কোন মুসলমানের বুকের পাটা আছে কোরানকে অস্বীকার করার ? নিচে গনিমতের মাল সম্পর্কিত আয়াতটি তুলে ধরলাম, সেই সাথে একটি হাদিস, আমার রেফারেন্সগুলো যদি অপব্যাখ্যা হয়, ক্ষমতা থাকলে এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যাটা দিয়ে যাস, আমার মুখ বন্ধ করার জন্য হিজড়ার মতো শুধু শুধু রিপোর্ট করে আই ডি ব্লক করাস না, বা কমেন্টে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করিস না।
“ইসলাম প্রবর্তনের আগে লুঠের মাল ভোগ করা বৈধ ছিলো না, কিন্তু আল্লা আমাদের দুর্দশা ও দুর্বলতা দেখে লুটের মাল ভোগ করা বৈধ করেছেন।”- (মুসলিম হাদিস, ৪২৩৭)
“আর তোমরা জেনে রাখো যে, তোমরা যে গনিমতের মাল লাভ করেছো, তার এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তার রসূল এবং আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম মিসকিন ও পথিক মুসাফিরদের জন্য নির্দিষ্ট।”- ( কোরান, ৮/৪১)
যা হোক, মুসলমানরা যতই গায়ের জোরে বলুক এই হাদিস ঠিক নয় বা এগুলো কোরানের অপব্যাখ্যা, কিন্তু ওরাও জানে প্রকৃত সত্যাটা কী ? কিন্তু সবাই তো আর সানিউর রহমান বা মুফাস্সিলদের মতো বিবেকবান, হুরের সাথে সেক্স করার ব্যাপারে নির্লোভ এবং সাহসী নয় যে, তারা সত্যকে স্বীকার করে ইসলামক ত্যাগ করে মুসলমান থেকে মানুষ হবে, তাই নিজেদের নবীর লুণ্ঠনকে জায়েজ করার জন্য- কৃষ্ণকে তারা চোর বানাচ্ছে, ভাবখানা এমন যে, আমাদের নবী ডাকাতি করেছে তো কী হয়েছে, হিন্দুদের ভগবান কৃষ্ণও তো চোর, সুতরাং সমান সমান। কিন্তু ভাষাগত জ্ঞানের অভাবে অধিকাংশ মুসলমান সম্ভবত এটাও জানে না যে, চোর আর ডাকাত সমান নয়। চোর চুরি করে চুপি চুপি, আর ডাকাত ডাকাতি করে সবার সামনে। কৃষ্ণ নিজের ঘরে চুরি করতো জীব সেবার জন্য বানরদের খাওয়াতে, যেটাকে বলে দুষ্টুমি, আর মুহম্মদ জিহাদের নামে ডাকাতি শুরু করেছিলো মুসলমানদের দারিদ্রতা ঘোচাতে এবং কোরাইশদের উপর প্রতিশোধ নিতে।
যা হোক, সবার অলক্ষ্যে কৃ্ষ্ণ ননী চুরি করতো বা এই রকম ছোটাখাটো দুষ্টুমি করতো বলে একদিন যশোদা কৃষ্ণের উপর বিরক্ত হয়ে ওকে একটি উদূখলের সাথে বেঁধে রাখতে যায়। উদূখল এমন একটি কাঠের বস্তু যার দুই দিক মোটা ও মাঝখানে সরু এবং এটাকে খাড়া করে রাখলে যেমন মাটির ‘গাছা কুপির’ মতো দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি ফেলে দিলে বা আড়াআড়ি করে রাখলে চাকার মতো গড়িয়ে যেতে পারে। এই উদূখল নিশ্চয় প্রাচীনকালে বাড়ির কোনো কাজে লাগতো, তাই হয় তো সেটা যশোদার বাড়িতে ছিলো। তো যশোদা সেই উদূখল, যেটা সাইজে ছিলো প্রায় কৃষ্ণের দ্বিগুন, সেটার সাথে কৃষ্ণকে বেঁধে রাখতে যায়, কিন্তু দেখে দড়িতে কম পড়ছে, তাই আবার দাড়ি জোড়া দেয়, কিন্তু তারপরও দড়ি কম পড়ে। এভাবে যতবারই দড়ি জোড়া দিয়ে বড় করে কৃষ্ণকে বেঁধে রাখতে যায়, ততবারই দড়ি কম পড়ে। শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণ একটি হাসি দিয়ে তার বন্ধনকে স্বীকার করে নেয় এবং যশোদা কৃষ্ণকে বাঁধতে সক্ষম হয়। এইভাবে কৃষ্ণকে বেঁধে রেখে যশোদা যেই বাড়ির অন্য কাজে মন দিয়েছে, তখনই- কেবল হাঁটতে শেখা কৃষ্ণ, হামাগুড়ি দিয়ে টান দিয়ে ঐ উদূখল ফেলে দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করে, এভাবে এক সময় কৃষ্ণ সেটা টানতে টানতে বাড়ির বাইরে নিয়ে চলে যায়।
বলরাম ছিলো কৃষ্ণের এক দেড় বছরের বড়, সেই সময় বলরাম অন্য একজনের সাথে বাড়ির বাইরে খেলছিলো এবং খেলার মধ্যেই খেয়াল করে, কৃষ্ণ, হামাগুড়ি দিয়ে টানতে টানতে একটি উদূখলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির বাইরে এক জায়গায় দেড় দুহাত দূরত্বে দুটো অর্জুন গাছ ছিলো, কৃষ্ণ, ঐ দুই গাছের ফাঁক দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যায়, ফলে উদূখলটি ঐ দুই গাছের মধ্যে আটকে যায়। কিন্তু কৃষ্ণ তারপরও টানতে থাকে, ফলে ঐ গাছ দুটি উপড়ে পড়ে যায়। এরপর গাছ পড়ার শব্দে সবাই ছুটে আসে এবং কিভাবে এটা ঘটলো তা কেউ বুঝতে পারে না, শুধু তাই নয়, কৃষ্ণ, ঐ পড়া গাছ দুটির মধ্যে মধ্যে বসে আছে, এটা দেখেও তারা অবাক হয়ে ভাবতে লাগে যে কৃষ্ণ সেখানে কিভাবে এলো এবং কৃষ্ণের উপর যদি গাছ দুটো পড়তো তাহলে তার কী অবস্থা হতো ? কিন্তু বলরাম যখন বলে যে, কৃষ্ণই ঐ দুটো গাছ ফেলে দিয়েছে, তখন সেটা শুনে উপস্থিত সবাই আরো আশ্চর্য হয় এবং কৃষ্ণ যে কোনো সাধারণ শিশু নয়, তার প্রমান তারা আরো একবার পায়।
ভয়ংকর বিশাল সাপ কালীয়কে দমন বা মল্লযুদ্ধে কংসকে পরাজিত করে হত্যা করা ছিলো কৃষ্ণের দুঃসাহসিক কাজ; কিন্তু আঙ্গুলের উপর পর্বত তুলে ধরা বা বিশাল দুটো অর্জুন গাছকে ফেলে দেওয়া এসব ছিলো কৃষ্ণের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কাজ। এই সব অবিশ্বাস্য কাজ বা দুঃসাহসের জন্যই কৃষ্ণের আরেক নাম হয় ‘দামোদর’ অর্থাৎ ‘অসম সাহসী’ বা ‘অসীম ক্ষমতাবান’, যে শব্দের উৎপত্তিগত ব্যাখ্যা শুরুতেই দিয়েছি। কৃষ্ণ এই লীলা যে মাসে ঘটিয়েছিলো সেই মাসের নাম হয় দামোদর, যার বর্তমান প্রচলিত নাম কার্তিক মাস। একারণেই কার্তিক মাসের আরেক নাম দামোদর মাস।
অনেকেই জানেন যে, দুর্গার ছেলে কার্তিকেরও আরেক নাম দামোদর, এর কারণ হলো কার্তিকের দুঃসাহসিক যুদ্ধ নৈপুন্য এবং এজন্যই দামোদর বা কার্তিক মাসের শেষ দিনে উদযাপিত হয় কার্তিক পূজা।
কৃষ্ণের দুঃসাহসিক ও অবিশ্বাস্য সব কাজ-কারবারের জন্য কৃষ্ণকে না হয় দামোদর বলা হয়, কিন্তু বিষ্ণুর আরেক নাম দামোদর কেনো ? বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার কৃষ্ণ, এজন্য কৃষ্ণের কারণে বিষ্ণুকে দামোদর বলা হয়, যেটা আগেই বলেছি; এটা একটা কারণ, কিন্তু অন্য কারণ হলো, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের মধ্যে পৃথিবীতে বিষ্ণুর অবদানই সবচেয়ে বেশি; কেননা, পৃথিবীর সকল অবতার বিষ্ণুর এবং শুধু কৃষ্ণই নয়, বিষ্ণুর সকল অবতারই দুঃসাহসিক ও অবিশ্বাস্য সব কাজ করেছে; সকল মন্ত্রীর কাজের ক্রেডিট যেমন প্রধানমন্ত্রীর, মন্ত্রীরা সফল হলে যেমন প্রধানমন্ত্রীও সফল, তেমনি সকল অবতারের দুঃসাহসিক সব কাজের কর্তা হিসেবে বিষ্ণুর নামও দামোদর।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে দামোদর ব্রত করা হয় কেনো ?
এই ব্রত পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষ্ণের শিশু কালের ঐ দুটি ঘটনা- যশোদা কর্তৃক কৃষ্ণকে দড়ি দিয়ে বাঁধার চেষ্টা এবং কৃষ্ণ কর্তৃক দুইটি বিশাল আকৃতির অর্জুন গাছ সমূলে উৎপাটন করা যাকে বলা হয় যমলার্জুন ভঙ্গ- তা স্মরণ করে কৃষ্ণের ক্ষমতাকে উপলব্ধি করা এবং প্রকৃতিতে ঘটা সকল কারণের মূল হিসেবে কৃষ্ণের শরণ নেওয়া এবং অন্যেরা যাতে তার শরণ নেয়, সেজন্য ঘটনাগুলো যতটা সম্ভব প্রচার করা।
এরপর প্রশ্ন হচ্ছে, কিভাবে এই ব্রত পালন করা হয় ?
এই ব্রত পালনের সবচেয়ে ভালো অপ্রচলিত উপায় হলো, এই ঘটনাগুলো প্রচার করে মানুষকে কৃষ্ণ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করা। এর বাইরে প্রচলিত উপায়টি হলো- বাড়ির বাইরে সব মন্দিরে এবং বাড়িতে হলে বাড়ির মন্দির বা তুলসী তলায় ঘি বা তিলের তৈল দিয়ে সলতার মাধ্যমে প্রদীপ জ্বালিয়ে বা সরাসরি প্রদীপ পাত্রে কর্পূর রেখে তাতে আগুন দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে তা বিষ্ণু এবং কৃষ্ণকে স্মরণ করে দান করা। এভাবে প্রতিদিন দীপ বা বাতি দান করতে হবে পুরো কার্তিক মাস জুড়ে।
যা কিছু নিষ্ঠাসহকারে পালন করা হয় তাকেই বলে ব্রত। যেহেতু পুরো কার্তিক মাস জুড়ে এটা পালন করা হয় এবং কার্তিক মাসের অপর নাম দামোদর মাস, তাই এই ব্রতের নাম হয়েছে দামোদর ব্রত এবং একারণেই সমগ্র মাসের মধ্যে কার্তিক মাসকে হিন্দুরা শ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে মনে করে, যদিও গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, " মাস সমূহের মধ্যে আমি অগ্রহায়ণ।"
যা হোক, এই কার্তিক মাসে- মাশকলাই, বেগুন, বরবটি, শিম খেতে নিষেধ করা হয়েছে, এর সাথে অনেকে সারা মাস ধরে আমিষ জাতীয় কোনো কিছু খায় না, এতে তারা মনে করে তাদের ব্রত পালন আরো বেশি নিষ্ঠা সহকারে হচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি না এর কোনো প্রয়োজন আছে; কারণ, একবার চুরি বা খুন করলে আপনি যেমন সারা জীবনের জন্য চোর বা খুনি, তেমনি একবার মাছ মাংস জাতীয় আমিষ খাবার খেলেও আপনি সারা জীবনের জন্য আমিষভোজী। সারা বছর ধরে মাছ মাংস খেয়ে বছরের কয়েকটি দিন নিরামিষ খাওয়ার ভান করাটা ভণ্ডামী। কিন্তু যেহেতু উপবাসের দিনগুলোতে ধান, গম, তৈল ও ডাল ও ভুট্টা জাত কোনো খাবার খেতে নিষেধ করা হয়েছে, সেহেতু উপবাস পালন করলে প্রাকৃতিক নিয়মেই আপনি নিরামিষ খাবার খেতে বাধ্য হবেন, একাদশীর উপবাসের আগের ও পরের দিন অনেকেই নিরামিষ খায়, এটা চলতে পারে; কারণ, আধ্যাত্মিক কারণ বাদ দিলেও উপবাস রাখার মূল কারণ শরীর রক্ষা করে সুস্থ থাকা। তাই এই উপবাস উপলক্ষ্যে যদি মাসে কয়েক দিন নিরামিষ খাওয়া হয় তাহলে মানুষের রুচি চেঞ্জ হয় এবং খাবার দাবারের এক ঘেঁয়েমি দূর হয়, যেটাও স্বাস্থ্যসম্মত। তাই উপবাসকালীন দুই এক দিন নিরামিষ চলতে পারে, কিন্তু মাসব্যাপী ব্রত পালনের সময় নিরামিষ খাওয়ার কোনো যুক্তি নেই, কারণ এতে শরীরের ক্ষতি হবেই হবে। আর এটা জেনে রাখুন যে হিন্দু ধর্মের সকল বিধি বিধান শরীর স্বাস্থ্য রক্ষা করার জন্য, শরীর ধ্বংস করার জন্য নয়। এখানে অল্প একটু বলে রাখি, হিন্দু শাস্ত্রের কোথাও বলা নেই যে নিরামিষ খেতে হবে; নিরামিষের ধারণাটা এসেছে ‘জৈন মতবাদ’ থেকে এবং বাংলায় এর প্রবক্তা চৈতন্যদেব। এ ব্যাপারে “আমিষ নিরামিষ” নামে আমার একটি পোস্ট আসছে, সেখানে ডিটেইলস তথ্য প্রমান পাবেন।
দামোদরের ব্রতের মূল ঘটনা যদিও একদিনের, কিন্তু মাসব্যাপী এটা পালন করার মূল কারণ হলো এর আধ্যাত্মিকতা। এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শৈশব লীলা, তাই মনে করা হয়, শিশুদেরকে যেমন খুব সহজেই খুশি করা যায়, তেমনি শিশুরূপী ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে এই এক মাসে মনযোগ দিয়ে আরাধনা করলেও ভগবানের কৃপালাভ করা খুবই সহজ হবে। এজন্যই এই মাসের এত গুরুত্ব এবং বলা হয়েছে, এই মাসে শ্রীহরি অর্থাৎ বিষ্ণু বা কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে দীপ দান করলে তাকে আর এই জন্ম-মৃত্যুময় সংসারে ফিরে আসতে হয় না। কারণ দামোদরে দীপদান, দীপাবলীর আয়োজন, আকাশদীপ দান করলে শ্রীহরি অত্যন্ত প্রসন্ন হন, দীপদাতার সমস্ত পাপ বিনষ্ট হয়, শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে একটি মাত্র প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের ফলে অশেষ মঙ্গল সাধিত হয় এবং প্রদীপদানের এত মহিমা যে তা বলে শেষ করা যাবে না।
এককথায় হরিভক্তি লাভের সহজ উপায় হলো দামোদর মাসে প্রদীপ দান। এই মাসে ভগবান বিষ্ণুর সেবা একগুণ করলে সহস্রগুণ ফল লাভ করা যায় বলেও পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে। এছাড়াও বলা আছে, এই পূণ্য মাসে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে কেউ যদি একটি প্রদীপ দান করে তবে তার সমস্ত পাপ নাশ হবে এবং তার পুনর্জন্ম আর হবে না, তিনি সংসারে অজেয় ও অক্ষয়কীর্তি স্থাপন করবেন।
আরো বিশ্বাস করা হয় যে, প্রদীপের আলোতে যেমন চারদিক আলোকিত হয়ে সমস্ত অন্ধকার দূর হয়; তেমনি ভক্তি ও জ্ঞান দ্বারা সকলের পাপ দূরীভূত হবে। অর্থাৎ, প্রদীপের আলোর শিখা যত উজ্জ্বল হতে থাকবে, ততই তার পাপ ক্ষয় হতে থাকবে। স্কন্ধ পুরাণে বলা হয়েছে, এই মাসে যে প্রদীপ দান করে না- সে ব্রহ্মঘাতী, গোঘাতী, স্বর্ণ অপহারী ও সদা মিথ্যাবাদী। আরো বলা হয়েছে, দামোদর মাসে সম্পূর্ণ ভক্তি, বিশ্বাস ও প্রেম দ্বারা ভগবান বিষ্ণুর পূজা করলে দেহান্তে বৈকুন্ঠ লাভ বা মুক্তি লাভ হয়। তাই, আপনারা অন্তত পক্ষে একটি প্রদীপ ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে জ্বালান এবং বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার কৃষ্ণের এই লীলার কথা প্রচার করুন।
জয় শ্রী কৃষ্ণ
.jpg)
No comments: